আজ রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ০৩:৩৮ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

বিশেষ প্রতিনিধিঃআগামীকাল ১ ফেব্রুয়ারি, শনিবার- অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন ঢাকা সিটি নির্বাচন। প্রতিবারের ন্যায় এবারও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনীত চার প্রার্থী লড়াই করছেন দুই সিটি জয়ের আশায়। যার আনুষ্ঠানিক প্রথম ধাপ ‘প্রচারণা’র শেষ হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার।

সিটি জয়ের প্রতিযোগিতায় প্রচারণার মধ্যে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ব্যতীত অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা কিংবা বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা না ঘটলেও এক ধরনের চাপা আতঙ্কের মধ্যেই রয়েছে ভোটারসহ সিটিতে অবস্থানরত বহিরাগতরা।

এদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের পাল্টাপাল্টি ‘অস্ত্রধারী গুন্ডারা ঢাকায় অবস্থান’ নেয়ার অভিযোগই আতঙ্কের মূল কারণ। এতে ভোটাররা যেমন রয়েছে স্নায়ুবিক শঙ্কায়, তেমনি বিভিন্ন প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নাগরিকরাও রয়েছেন আতঙ্কের মধ্যে।

ইতোমধ্যে সরকার বহিরাগতদের ধরতে অভিযানও শুরু করেছে। অভিযানের প্রেক্ষিতে অনেকেই বলছেন, এ ধরনের অভিযানে বলিই হয় বস্তি থেকে শুরু করে মেসের বাসিন্দা, ভাসমান মানুষ ও বিভিন্ন প্রয়োজনে ঢাকায় আসা সাধারণ মানুষ। কেউ বেড়াতে, কেউ অসুস্থ স্বজনকে দেখতে হাসপাতালেও আসতে পারেন।

এসব মানুষরা কীভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দেখাবেন যে- তারা ভাড়া করা অস্ত্রধারী গুন্ডা নয়। এ আতঙ্ক যখন জনমনে তখন র্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহম্মেদ বলছেন, নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রার্থীর ক্যাম্পেইন করার জন্য যারা ঢাকার বাইরে থেকে এসেছিলেন, তাদের থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ, এবার আপনারা চলে যান।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে অপ্রয়োজনীয় কোনো লোকের অপতৎপরতা আমরা চাই না। আজ রাতে প্রচারণা শেষ হয়ে যাবে। যদি কেউ থেকেও যান, আশা করব, আপনি যেখানে আছেন সেখানেই থাকবেন।

তবে যারা জেনুইন ভোটার তাদের চলাফেরা ও ভোটদানে সহযোগিতা করবেন। কোনো ঝামেলা করবেন না, কোথাও জড়ো হবেন না। ইটস আওয়ার ইনস্ট্রাকশন (এটা আমাদের নির্দেশনা)।

এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলামও বলেছেন, পুলিশের কাছে খবর ছিলো নির্বাচনকে সামনে রেখে সন্ত্রাসীরা ঢাকায় জড়ো হচ্ছে। তবে কারা জড়ো হচ্ছে- তা তিনি স্পষ্ট করেননি।

তবে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, তারা বিএনপি। খন্দকার মোশাররফ বলেছেন, তারা আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক বড় দুই দলের সিটি জয়ের প্রতিযোগিতায় অবস্থা যখন এই তখন আতঙ্কে না পড়ার কারণও দেখছেন না ভোটাররা, প্রয়োজনের তাগিদে ঢাকায় আসা বহিরাগতরাসহ সাাধারণ নাগরিকরাও।

তবে আতঙ্ক কাটাতে এবং ভোটগ্রহণ নির্বিঘ্ন করতে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ৫০ হাজার সদস্য মোতায়েন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ ও আনসার নিয়োজিত থাকছে।

আর বিজিবি, র‌্যাব ও নৌ-পুলিশ নির্বাচনি এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন বাহিনী বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ভোটের দায়িত্বে নিজ নিজ সদস্যদের নির্দিষ্ট জায়গায় মোতায়েন করেছে।

নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৬ জন ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ১৮ জন করে বিভিন্ন বাহিনীর ফোর্স মোতায়েন থাকবেন।

সাধারণ কেন্দ্রে একজন এসআই অথবা এএসআইয়ের নেতৃত্বে চারজন পুলিশ সদস্য, অস্ত্রসহ আনসার দুজন ও ১০ জন অঙ্গীভূত আনসার মোতায়েন থাকবেন। আর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পুলিশের সংখ্যা দুজন বেশি থাকছে।

দুই সিটিতে দুই হাজার ৪৬৮ কেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ৫৯৭টি কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ। আর সাধারণ কেন্দ্র রয়েছে ৮৭১টি। এই হিসেবে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিয়োজিত থাকবে আনসার ও পুলিশের ৪২ হাজার ৬৮২ জন সদস্য।

আর ভোটের এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য দুই সিটির মধ্যে উত্তর সিটিতে ২৭ প্লাটুন ও দক্ষিণ সিটিতে ৩৮ প্লাটুন বিজিবি জোয়ান নিয়োজিত রয়েছে। প্রতি দুটি সাধারণ ওয়ার্ডে এক প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন থাকবে।

বিজিবির প্রতিটি টিমের সঙ্গে ৩০ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একজন করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৫৪ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৭৫ জনসহ ১২৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন।

এছাড়া পুলিশ ও এপিবিএনের সমন্বয়ে ১২৪টি ভ্রাম্যমাণ ও ৪৩টি স্ট্রাইকিং টিম, র্যাব, পুলিশ, এপিবিএন স্ট্রাইকিং ও ভ্রাম্যমাণ টিম মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজারের মতো ফোর্স মোতায়েন থাকছে। সবমিলিয়ে এ নির্বাচনে ৫০ হাজারের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত থাকবে।

এবার ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ১ হাজার ৩১৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোটকক্ষ থাকছে ৭ হাজার ৮৫০টি। ভোটার ৩০ লাখ ৯ হাজার। দক্ষিণ সিটিতে ১ হাজার ১৫০ ভোটকেন্দ্রে থাকবে ৬ হাজার ৫৮৯টি ভোটকক্ষ। এ সিটি কর্পোরেশনে ভোটার সংখ্যা ২৪ লাখ ৫২ হাজার।

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর জানান, প্রয়োজনবোধে মাঠ প্রশাসন তাৎক্ষণিক যেখানে যেমন দরকার সে অনুযায়ী যেকোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়োজিত করার নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচনি আচরণবিধি প্রতিপালন ও অপরাধের বিচার কাজের জন্য দুই সিটিতে ১২৯ জন নির্বাহী হাকিম ও ৬৪ জন বিচারিক হাকিম নিয়োগ করা হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটিতে ৫৪ জন ও দক্ষিণ সিটিতে ৭৫ জন নির্বাহী হাকিম গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনি মাঠে থাকবেন। এছাড়া উত্তর সিটিতে ২৭ জন ও দক্ষিণে ৩৭ জন বিচারিক হাকিম দায়িত্ব পালন করবেন বৃহস্পতিবার থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যারা ঢাকার বাইরে থেকে প্রচার-প্রচারণা জন্য ঢাকায় এসেছেন, তবে কেউ যদি ঢাকায় অবস্থান করেন সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে র্যাব কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন কি না— জানতে চাইলে র্যাব ডিজি বেনজীর আহম্মেদ বলেন, আমরা ওই পর্যন্ত যাচ্ছি না, ঢাকার বাইরের কেউ ঢাকায় অবস্থান করলে তাদের জেলে পাঠাবো এমন নয়।

প্রত্যেকটা মানুষের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে, জেল জুলুমের ভীতি আমরা দেখাতে চাই না। আমার মনে হয় না, আমার সেই পর্যায়ে রয়েছি। আমরা আহ্বান রেখেছি যেন, শহরে যারা জেনুইন ভোটার তারা সহজে শান্তিপূর্ণভাবে ও সাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারে এবং নিরাপদ পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।

মূলত, শৃঙ্খলা রক্ষা করাই হচ্ছে আমাদের আহ্বানের মূল লক্ষ্য। কাউকে জেলে পাঠানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে যদি কেউ জেলে পাঠানোর মতো কাজ করেন, তাহলে তো জেলেই যাবেন।

নির্বাচনের দিন নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা রয়েছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, অতীতের হিস্ট্রি যদি দেখেন তাহলে এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন ছাড়া কিছুই না। আবার পার্শ্ববর্তী দেশের নির্বাচনকালীন অবস্থা যদি দেখেন তাহলে এসব ঘটনা কিছুই না। তুচ্ছ ঘটনাকে বড় করে দেখার কিছু নাই আবার এটাও ঠিক, তুচ্ছ ঘটনাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

যদি আইনবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড ঘটে তাহলে সংক্ষুব্ধ হয়ে যেকোনো প্রার্থী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে কমপ্লিন করতে পারেন কিংবা থানায় অভিযোগ করতে পারেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বাইরে থেকে বিপুল পরিমাণ নেতাকর্মী ঢাকায় এনেছেন।

এ বিষয়ে র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, আমি রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। তবে আমি বলব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে অপ্রয়োজনীয় কোনো লোকের অপতৎপরতা চাই না। নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সহিংসতার আশঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওনারা আশঙ্কা করতে থাকুক আর আমরা নির্বাচন করি অসুবিধা নাই।

কাউন্সিলর পদপ্রার্থী এলাকায় কতগুলো কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ আছে তিনি বলেন, আমি সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ না করে বলি, নির্বাচন সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে নাম অনুযায়ী প্রতিটা কেন্দ্র আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং আমরা প্রতিটি কেন্দ্রে সিকিউর করার চেষ্টা করবো।

বিদ্যমান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যারা আছেন আমরা প্রত্যাশা করবো, তারা গণতন্ত্র ও মূল্যবোধ প্রদর্শন করবেন। কোনো ধরনের ঝামেলা সৃষ্টি করবেন না, কেউ যদি কোনো কারণে সংক্ষুব্ধ হন তাহলে আইনের আশ্রয় নিন। আমরা সবাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই।বিগত সময়ে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জ্বালাও-পোড়াও পেট্রলবোমাহামলার ঘটনা ঘটেছে।

এবার নির্বাচনে এ ধরনের অপতৎপরতা হলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেবেন র্যাব মহাপরিচালক বলেন, অতীতে তাদের কি ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হয়েছে আমরা সবাই জানি। তারা স্বীকার করেছেন। জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তার ফলাফল স্বরূপ কারাভোগ করছেন।

যদি তারা সামান্য মূল্যায়ন করে থাকেন তাহলে কখনই তারা একই কাজ আবার করবে না। আর যদি কেউ লিপ্ত হন তাহলে আমরা জনগণকে, দেশকে ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য আগে যে পরিমাণ ক্যাপাসিটি নিয়ে তাদের মোকাবিলা করেছি তার চেয়ে অনেক বেশি ক্যাপাসিটি নিয়ে তাদের মোকাবিলা করব।

র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। যাতে প্রতিটি ভোটার নিরাপদ পরিবেশে ভোট প্রদান করতে পারে।

তারা যাকে ইচ্ছে তাকে ভীতিমুক্ত পরিবেশে ভোট প্রদান করতে পারেন। গত নির্বাচনের চেয়ে এবার বেশি র্যাব সদস্য মাঠে থাকবে। প্রতিটি কেন্দ্রে র্যাবের নেতৃত্বে একটি করে অফিসারের নেতৃত্বে পেট্রোলিং থাকবে।

ঢাকায় পাঁচটি ব্যাটালিয়ন রয়েছে, স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে। যাতে যেকোনো আপদকালীন পরিস্থিতি অল্প সময়ের মধ্যে মোকাবিলা করতে পারি। কমান্ড বাহিনী ছাড়াও হেলিকপ্টার, বোম্ব স্কোয়াড, ডগ স্কোয়াড মোতায়েন থাকবে। তাছাড়া ২৪ আওয়ার স্পেশাল মনিটরিংয়ে থাকবে।

এদিকে সিটি নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামন খান কামাল। তিনি বলেন, আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

তারা যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। ছোটখাটো যে দু-একটি ঘটনা ঘটছে সে বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। ঢাকাবাসী উৎসবের মধ্যে দিয়ে ভোটে অংশগ্রহণ করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

0Shares

 
 
 

আরও পড়ুন

 

Top